Sale!

ভোগের রান্না: ভারতীয় অধ্যাত্মবাদ ও খাদ্য সংস্কৃতি

Original price was: ₹700.00.Current price is: ₹560.00.

সোমব্রত সরকার

প্রচ্ছদ- সেঁজুতি বন্দ্যোপাধ্যায়

Category:
গুড়ের সঙ্গে আতপচালের গুঁড়ি মিশিয়ে তৈরি বাংলার অতীব প্রাচীন মিষ্টি গুড়সন্দর্ভ দিয়েই গৌড়দেশের আশ্রম-আখড়াতে একটা সময় দেবভোগ দেওয়া হত। গুড়ের আগে চিনির মিষ্টি ভোগের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ছিল।
খেজুর, তালের রস যারা কাটত তারা সব অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ বলেই ব্রাহ্মণ ঠাকুরেরা গুড়ের মিষ্টি দেবতার ভোগে দিতে চাইতেন না।
ছানা নিয়েও ছিল গণ্ডগোল। মিহি ছানার মিষ্টিতে থাকত প্রাণীজ বস্তুর উপাদান- গোঁড়া ব্রাহ্মণেরা তাই বাজার থেকে কেনা ছানার মিষ্টি ভোগের দ্রব্য হিসেবে ব্যবহার করতেন না।
ক্ষীরের মিষ্টিতে এসবের বালাই ছিল না বলে ক্ষীরিকা ছিল গোপালভোগের প্রধান মিষ্টান্ন। রসবড়া, নারকেল ছাপা, মোহনভোগ, রসকড়া এসব ঘরোয়া মিষ্টি দেবভোগের জন্য একটা সময় বাড়িতে, মঠ-আখড়া-শ্রীপাটে তৈরি হত।
দেবভোগে ছানার মিষ্টির প্রচলন ঘটল চৈতন্যভক্তদের হাত ধরেই। বৃন্দাবনের ভক্ত বৈষ্ণবদের মাধ্যমে বাংলায় পৌঁছলো বেসন ও ময়দার মিষ্টি।
গোটা দক্ষিণ ভারতেই দেবতার ভোগ হয় ঘৃতপক্ক ও তেলপক্ক খাদ্যবস্তুতে। নর্মদার সাধকেরা দেবীভোগে নিবেদন করেন ঘিওড়ি।
পাথরের থালায়, পেতলের পরাতে, রূপোর রেকাবিতে সাজানো পুরিকাভোগ, ভাজাভোগ, লাড্ডুভোগ, তৃষ্টান্নভোগ, পকান্ন ও পানকভোগের এলাহি আয়োজন।
ভোগের রকমফের আছে- ক্লিন্নভোগ, দূষিতভোগ, অমৃতভোগ। ত্যাগ করে, নিবেদন করে, সমর্পণ করে ভোগ থেকেই আমরা সক্কলে প্রসাদ পেতে চাই, এমন বোধের ভোগপ্রসাদই তখন অমৃতময় হয়ে ওঠে।
তন্ত্রে রয়েছে চিতা জাগানির ভোগ, শিবাভোগ, এঁটোভোগ, কারণভোগ। ছাগলের দুধের ক্ষীর, লুচি, বুটের ডাল, শুক্তনি, ডুমুরের ডালনা, কুমড়ো-তেঁতুলের অম্বল, ভাজা, মোচার ঘণ্ট, লাউ ঘণ্ট, সোনা মুগের ডাল, পান্তা ভাত, কচুশাক- নিরামিষ অন্নভোগের পাশাপাশি দুর্গা, মনসা, রাজলক্ষ্মী, কালী পুজোর ভোগ হয় বলির পাঁঠার মাংসে, বলির হাঁস ও পায়রায়, সঙ্গে থাকে ইলিশ, রুই, কাতলা, চিতল, পাবদা, বোয়াল মাছ।
শাপলা চালের ভাত, শূকরের মাংস হয় কুচবিহারের বড়দেবীর ভোগে, বর্গভীমার ভোগে থাকে শোল মাছ। শ্মশানে পঞ্চমুণ্ডির আসনে সদাশিবের ভোগে সরায় করে দেওয়া হয় খিচুড়ি, পোলাও, মাছ, মাংস, মদ।
বীরাচারীরা ভোগে দেন পাঁঠা, মোষ-ভেড়া-শুয়োর- মুরগি পর্যন্ত বলি হয়। দক্ষিণাচারীরা ফল বলি দেন। পশ্বাচারীরা ভোগ্যবস্তুর বলিদান দেন-ভাত, ঘি, মধু, চিনি, বাতাসার মিষ্টি ও ফল থাকে।
রহস্য পুজোর বলির মাংস, বুড়ো শোল, পাকা রুই রান্না হয় বিশেষ নিয়মে। শ্মশানকালীর ভোগে দেওয়া হয় মাসুরি চালের ভাত।
বাহান্নভোগে হয় বিট বাটা, গুড়ি কচুর তরকারি, নারকেল বাটা, চুকাই ফলের চাটনি, ডাবের পায়েসের মতো প্রাচীন রান্না।
দক্ষিণ ভারতের ভয়ঙ্করা মাতা পেরিয়াচি আম্মানের ভোগ রান্না হয় পাকা তেঁতুলের ক্বাথে ভাত মিশিয়ে। মধুমতী দেবীর ভোগ হয় কাঁচা মাংস, মাছ ও মদিরাতে। গুজরাটের বহুচরা মাতার ভোগ হয় ঘিয়ে ভাজা আটার লুচি আর আটার হালুয়া রান্না করে।
মা বসুমতীর ভোগে থাকে মারিপিঠা, রান্নাপুজোর ভোগ হয় ফোড়ন ছাড়া ডালে। ভাদ্র সংক্রান্তির ভোগ হয় পান্তা ভাত, চুনো মাছের টক দিয়ে। ক্ষেত্রলক্ষ্মী, অরুণালক্ষ্মীর ভোগে থাকে সব্জি-ফলের সিন্নি। নবান্নের ভোগে রান্না করা হয় নতুন গোবিন্দভোগ চালের পায়েস। গ্রামদেবতার ভোগ হয় পুকুরের মাছে।
গাছের ফল, জমির প্রথম ফসল অনেক গৃহস্থেরা দেবতার নামে উৎসর্গ করে রাখেন, তাকে কুটোভোগ বলে। চাষজমির সোনালি ধানই ভাদ্রলক্ষ্মী। ভাদ্রলক্ষ্মীর আমিষভোগে থাকে পুকুরের পাকা রুই মাছ, ভাজা, পুকুরধারের লালকচুর শাক, কচুর ডাঁটি দিয়ে কাঁঠালবিচির তরকারি, পাকা তেঁতুল দিয়ে কালো কচুপাতার খাট্টা, লাল শাক ভাজা, রুইয়ের মুড়ো দিয়ে ভাজা কলাইয়ের ঘন ডাল, মাছের কাননো দিয়ে মিশালি তরকারি। গামলায় ঢালা হয় জমির নতুন চালের অন্ন। চট্টগ্রামের মানুষেরা ভাদ্রলক্ষ্মীর আমিষভোগে খিচুড়ির সঙ্গে দেন ল্যোইটা শুঁটকির বড়া।
পৌষলক্ষ্মীর ভোগে দেওয়া হয় আতপচাল, কলা, লবঙ্গ, আদা, এলাচি, কপূর দিয়ে প্রস্তুত মকরচাল। শ্রীক্ষেত্রে এদিন জগন্নাথদেবের মকরবেশ।
ভোগ হয় চুরাশি রকমের ব্যঞ্জন সহযোগে।
বৃন্দাবনের অতি পুরনো মঠ খুঁটার আখড়ায় ভোগ হয় বেগুনের বিরিঞ্চি দিয়ে। পটল গোবিন্দম্ ভোগ হয় জয়দেবের আরাধ্য শ্যামরূপায়।
শ্রীক্ষেত্রে বিমলা মায়ের পারুষভোগ হয়। জগন্নাথদেবের রাজভোগ, ছত্রভোগ, উত্থাপনভোগ, কোঠভোগ, যাত্রাভোগ, ছাপান্ন ভোগের মিষ্টান্নদি, অন্ন, ব্যঞ্জন রান্না হয় মাটির হাঁড়িতে- সুবাস পখাল, মরিচপানি, আরিষা, তিপুরি, সরপুলি, লক্ষ্মীবিলাস, মাঠপুলি, সরু অন্ন, মিষ্টিকাণিকাসহ অভিনব সব ওড়িয়া রান্নাবান্নার শৈলীতে।
সব মিলিয়ে ভোগের রান্না গোটা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের রান্নাবান্না ও খাদ্য সংস্কৃতির এক অভিনব সংযোজন। রান্না হয় পবিত্র মনে, ভক্তির মাধুর্যরসে, খাওয়ার আগে তা নিবেদিত হয় ভগবানের সেবার উদ্দেশে।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “ভোগের রান্না: ভারতীয় অধ্যাত্মবাদ ও খাদ্য সংস্কৃতি”

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart
Scroll to Top